ছোট লেখা

রথো রাফি

লেখক: মাহবুব মোর্শেদ · প্রকাশকাল: ২৪ অক্টোবর ২০২৬
রথো রাফি ছিলেন আমাদের আজিজ মার্কেটের সঙ্গী।
নব্বই দশকে আজিজ সুপার মার্কেট কী বস্তু ছিল তা আজকের দিনের মানুষদের ব‍্যাখ‍্যা করা কঠিন।
তখন মোবাইল ফোন ছিল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থাকার প্রশ্নই নেই।
একটা কমন জায়গা তখন খুব দরকার হতো, যেখানে এসে একই ধরনের লোকেরা জড়ো হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এমন একটু মিটিং প্লেস ছিল। চারুকলাও ছিল।
পিজি হাসপাতালের চত্বরে অনেকে দেখা করতেন।
পুরনো বিশ্বসাহিত‍্য কেন্দ্রে অনেকে একত্রিত হতেন।
কিছু মানুষ আবার জার্মান কালচারাল সেন্টার, অলিয়সঁ ফ্রাঁসেজ, ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার ইত‍্যাদি ঘিরে এলিট আর্ট ও কালচার করেতেন।
কবি, লেখক, সাহিত্যিকদের কমন জায়গা ছিল আজিজ মার্কেট। কাউকে খুঁজে পেতে হলে বা জরুরি খবর দিতে হলে আজিজ। কে কী লিখেছেন জানতে হলে আজিজ মার্কেট। সাহিত‍্যে নতুন কী চিন্তা এলো তা জানতে আজিজ। আড্ডা দিতে চাইলে লোকের অভাব নেই। মফস্বল বা জেলা শহর থেকে কেউ এলে ঠিকানা আজিজ।
শাহবাগ থেকে পিজি পেরিয়ে ডানে যে মার্কেট, সেখানে গড়ে উঠেছিল অনেক বইয়ের দোকান। সেই বইয়ের দোকানগুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা।
শুধু কবি-সাহিত্যিকরা নন, দেখা গেল একসময় বামপন্থীদের আড্ডাও পল্টন ছেড়ে আজিজে এসে ভিড়লো। তরুণ চলচ্চিত্রকাররা তো আসতেনই। চারুকলা থেকে দলছুট হয়ে ছবির লোকেরা আসতেন, এমনকি গানের লোকেরাও আসতেন।
আজিজ মার্কেট একসময় এতটাই প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলো যে, সিনিয়র সাহিত্যিকরা আজিজ মার্কেটে কী হচ্ছে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন। নিয়মিত এই মার্কেটগামী সাহিত্যিকদের সমালোচনা করতেন।
তবে ব‍্যতিক্রমও ছিল। আজিজ মার্কেটে নিয়মিত আসতেন হুমায়ূন আজাদ। তরুণদের নিয়ে টিপ্পনী কাটতেন। আহমদ ছফা তো আজিজ মার্কেটে উত্থানপর্বের অফিস খুলেই বসেছিলেন।
তখন তরুণ সাহিত্যিকরা প্রায় সবাই বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত আজিজ মার্কেটে এভেইলএবল থাকতেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুপুর দুইটার বাসে উঠে আমি জ‍্যামভেদে তিনটা/চারটায় শাহবাগ নেমে আজিজ মার্কেটে যেতাম। ফিরতাম রাত নয়টার বাসে। পরে সেটি আটটায় ছাড়তো। কখনো ক‍্যাম্পাসের বাস মিস করলে ধামরাইয়ের বাসে করে ডেইরি ফার্মে নামতাম। ক‍্যাম্পাসে নিজেদের সার্কেল গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত আমি প্রতিদিন আজিজে যেতাম। মনে হতো, আজিজে যাবার জন‍্যই যেন ঢাকায় এসেছি।
ওইসময় রথো রাফির সঙ্গে পরিচয়। আজিজ মার্কেটের সাহিত‍্যিকরা মূলত বিভিন্ন কিসিমের লিটল ম‍্যাগাজিনের লেখক হিসেবে বিভক্ত হয়ে থাকতেন। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে অনেক লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতো। রথো ছিলেন প্রতিষ্ঠান বিরোধী লিটল ম‍্যাগাজিনগুলোর গ্রুপে। সম্ভবত দ্রষ্টব্য লিটন ম‍্যাগাজিনে লিখতেন। গাণ্ডীবে যুক্ত ছিলেন। সেই বিখ‍্যাত তপনদার সাথে। পরে মজনু শাহ, সুহৃদ শহীদুল্লাহ, লাকু রাশমনরা শিডদাঁড়া বের করলে রথো তাতে যুক্ত হন। এনারা গোপন সংগঠনের মতো কাজ করতেন। সারাদিন আড্ডা দিলেও নিজেদের ভেতরকার কথা কখনো বাইরে আনতেন না। দল ভাঙলেই শুধু কিছু কথা জানা যেত। ওনাদের কাছে নিজেদের গ্রুপের লেখকরাই বড় সাহিত‍্যিক। অন‍্যদের সাথে সম্পর্ক শুধু তর্কের। আর ওনাদের লিও তলস্তয় মানে সর্বকালের সেরা সাহিত্যিক ছিলেন সুবিমল মিশ্র।
প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা মূলত ছিল কলকাতার প্রক্সি ওয়ার। হাওয়া কলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অনেক প্রতিভাবান সাহিত‍্যিক প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা করতে গিয়ে খরচ হয়ে গেছেন।
অনেকে এর চক্করে পড়ে সময় মতো নিজেকে পড়াশোনা, চাকরি ইত্যাদিতে যুক্ত হতে পারেননি। অনেকে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সাথে তাল মেলাতে পারেননি। অনেকে লিটল ম‍্যাগাজিন আন্দোলনের ব‍্যর্থতার পর নেশার জগতে বা দেশের বাইরে চলে গেছেন।
রথো ছিলেন ইন্ট্রোভার্ট, সিরিয়াস টাইপের মানুষ। সাহিত‍্য নিয়ে তার নিজস্ব বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বদ্ধ সংস্কৃতিটা তাকে ডানা মেলতে দেয়নি‍। শেষ পর্যন্ত নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই পছন্দ করতেন।
আজিজ মার্কেটের পর আর সেভাবে রথোর সাথে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। মজনু ভাই দেশে থাকলে হয়তো হতো।
রথোর মৃত‍্যুর খবরে পুরনো দিনগুলো যেন তীব্র হাহাকারের মতো চোখের সামনে একটা চক্কর দিয়ে গেল।
তলে তলে কত সময় চলে গেল।
রথোর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

মন্তব্য করুন

আরও পড়ুন

ছোট লেখা বিভাগের অন্যান্য লেখা

সব ছোট লেখা →
বইমেলা ও পুরোনো মলাট ছোট লেখা

বইমেলা ও পুরোনো মলাট

নতুন বইয়ের ঘ্রাণ যেমন মানুষকে টানে, পুরোনো বইয়ের হলুদ পাতার ভাঁজে থাকা বিস্মৃত পাঠকের পেন্সিলের দাগ তেমনই আরেকটা উপন্যাস বলে...

২১ অক্টোবর ২০২৬ সম্পূর্ণ পড়ুন →
আর্কাইভ অনুসন্ধান

মাহবুব মোর্শেদের লেখা খুঁজুন